How does the human body experience time without a clock or calendar for 205 days underground
মাটির নিচে ২০৫ দিন ঘড়ি-ক্যালেন্ডার ছাড়া মানুষের শরীর কীভাবে সময় অনুভব করে? || How does the human body experience time without a clock or calendar for 205 days underground
![]() |
| Bangla eBook |
ঘড়ি নেই, ক্যালেন্ডার নেই, সূর্যের আলো নেই—শুধু মাটির গভীরে একাকী একজন মানুষ। বাইরে পৃথিবীতে দিন-রাত বদলাচ্ছে, মানুষ ঘুমাচ্ছে ও জেগে উঠছে, ক্যালেন্ডারের তারিখ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মাটির প্রায় ১৩৪ মিটার নিচে থাকা সেই মানুষের কাছে এসবের কোনও খবর নেই। তিনি জানেন না এখন সকাল, দুপুর না রাত। এমনকি কত দিন কেটে গেছে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বোঝার উপায় নেই।
এই অদ্ভুত ও সাহসী পরীক্ষার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফরাসি ভূতত্ত্ববিদ ও গুহা-গবেষক মিশেল সিফ্র। ১৯৭২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থিত একটি গুহার ভেতরে প্রায় ২০৫ দিন কাটিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—বাইরের পৃথিবীর সময়ের সব চিহ্ন সরিয়ে দিলে মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ক কীভাবে সময় অনুভব করে?
১৯৭২ সালের সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষা
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৩ বছর বয়সী মিশেল সিফ্র টেক্সাসের ডেল রিও-র কাছে অবস্থিত মিডনাইট কেভে প্রবেশ করেন। গুহাটি ছিল মাটির প্রায় ১৩৪ মিটার নিচে। সেখানে প্রবেশ করার পর তাঁর সামনে আর স্বাভাবিক পৃথিবীর মতো দিন-রাতের পরিবর্তন ছিল না।
সিফ্রের কাছে খাবার, পানি, কৃত্রিম আলো এবং প্রয়োজনীয় গবেষণার সরঞ্জাম ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—তাঁকে ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার দেওয়া হয়নি। বাইরের পৃথিবীতে তখন কী সময় বা কী তারিখ, সেটিও তাঁকে জানানো হয়নি।
গবেষকেরা বাইরে থেকে তাঁর বিভিন্ন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করতেন। কিন্তু সিফ্র নিজে সময়ের প্রকৃত হিসাব জানতে পারতেন না। তিনি নিজের ঘুম, জেগে থাকা, খাওয়া এবং অন্যান্য কাজের সময় নিজের অনুভূতির ওপর নির্ভর করে করতেন।
মানুষের শরীরের নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি
সিফ্রের গবেষণার মূল বিষয় ছিল মানুষের জৈবিক ঘড়ি বা biological clock। আমাদের শরীরের ঘুম, জেগে থাকা, শরীরের তাপমাত্রা, হরমোনসহ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট ছন্দ অনুসরণ করে।
সাধারণ পরিস্থিতিতে সূর্যের আলো, অন্ধকার, খাবারের সময়, মানুষের সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ঘড়ির সময় আমাদের এই ছন্দকে প্রায় ২৪ ঘণ্টার চক্রের সঙ্গে মিলিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
কিন্তু যখন এসব বাহ্যিক সংকেত সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন শরীরের নিজস্ব ছন্দ কীভাবে কাজ করে—সিফ্রের পরীক্ষা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করেছিল।
২৪ ঘণ্টার দিন বদলে গেল প্রায় ৪৮ ঘণ্টায়
পরীক্ষার সবচেয়ে আশ্চর্য ফলগুলোর একটি ছিল সিফ্রের ঘুম ও জেগে থাকার ছন্দের পরিবর্তন।
নাসার ১৯৭২ সালের নথি অনুযায়ী, তাঁর গড় দৈনিক ছন্দ প্রায় ২৫ ঘণ্টার কাছাকাছি ছিল। তবে পরীক্ষার কিছু সময়ে তাঁর ছন্দ প্রায় ৪৮ ঘণ্টার মতো দীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল।
তিনি কখনও প্রায় ৩৬ ঘণ্টা জেগে থাকতেন, এরপর প্রায় ১২ ঘণ্টা ঘুমাতেন। অর্থাৎ বাইরের পৃথিবীর ২৪ ঘণ্টার দিনের তুলনায় তাঁর অভ্যন্তরীণ সময়ের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজের অনুভূতি দিয়ে তিনি বুঝতে পারতেন না যে তাঁর একটি “দিন” বাস্তবে প্রায় ৪৮ ঘণ্টার কাছাকাছি হয়ে গেছে। তাঁর কাছে সেটি স্বাভাবিক সময়ের মতোই মনে হতে পারত।
সময়ের ধারণার সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক
শুধু ঘুমের ছন্দই নয়, দীর্ঘ একাকিত্ব তাঁর স্মৃতির ওপরও প্রভাব ফেলেছিল।
পরবর্তীকালে সিফ্র জানিয়েছেন, একই রেকর্ডিং বারবার শুনেও কখনও তাঁর মনে হয়েছে সেটি যেন প্রথমবার শুনছেন। দিনের বিভিন্ন ঘটনা আলাদা করে মনে রাখাও কঠিন হয়ে উঠেছিল।
স্বাভাবিক জীবনে সূর্যের আলো, মানুষের চলাফেরা, শব্দ, কাজের সময় এবং অন্যান্য ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে সময়ের বিভিন্ন অংশকে আলাদা করে সাজাতে সাহায্য করে। কিন্তু গুহার ভেতরে এসব সংকেত প্রায় অনুপস্থিত থাকায় সময়ের ঘটনাগুলোর মধ্যে স্বাভাবিক দূরত্ব অনুভব করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
একাকিত্বও ছিল বড় পরীক্ষা
গুহার পরীক্ষাটি শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছিল না; মানসিকভাবেও এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন অভিজ্ঞতা।
মাসের পর মাস কোনও মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা না হওয়া, স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সময়ের কোনও নির্ভরযোগ্য ধারণা না থাকা সহজ বিষয় নয়।
বাইরের পৃথিবীতে প্রতিদিন নতুন ঘটনা ঘটলেও সিফ্রের চারপাশে পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত সীমিত। ফলে একসময় একাকিত্ব ও মানসিক ক্লান্তিও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
মহাকাশ গবেষণায় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সিফ্রের গবেষণা শুধু গুহা-পরীক্ষা হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। মানুষের জৈবিক ছন্দ কীভাবে পরিবেশের সংকেতের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকা মহাকাশচারী, বিভিন্ন সময় অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতকারী বিমানচালক এবং দীর্ঘসময় সাবমেরিনে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ গুরুত্বপূর্ণ।
পৃথিবীর ২৪ ঘণ্টার দিন থেকে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে মানুষের শরীর কীভাবে নিজস্ব সময় তৈরি করে—সিফ্রের পরীক্ষাগুলো এই প্রশ্ন নিয়ে গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে।
১৯৯৯ সালেও আবার গুহায়
সিফ্রের গবেষণা ১৯৭২ সালেই শেষ হয়নি। প্রায় ৬০ বছর বয়সে, ১৯৯৯ সালে, তিনি আবার একটি দীর্ঘ গুহা-পরীক্ষায় অংশ নেন। এবার তিনি প্রায় ৬৯ দিন গুহার ভেতরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন।
এই পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বয়স বাড়ার সঙ্গে মানুষের জৈবিক সময় ও ঘুমের ছন্দ কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, তা বোঝা।
সময় আসলে কী?
মিশেল সিফ্রের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি সাধারণ কিন্তু গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—সময় কি শুধু ঘড়ির কাঁটায় মাপা একটি বিষয়, নাকি আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কও নিজের মতো করে সময় তৈরি করে?
ঘড়ি আমাদের বলে কতটা সময় পেরিয়েছে। ক্যালেন্ডার বলে কোন দিন বা তারিখ। সূর্য আমাদের দিন ও রাতের সংকেত দেয়। কিন্তু এসব সংকেত সরিয়ে দিলে মানুষের শরীর সম্পূর্ণভাবে সময়ের অনুভূতি হারায় না। বরং তার নিজস্ব জৈবিক ছন্দ সামনে চলে আসে।
মাটির নিচে ২০৫ দিনের মিশেল সিফ্রের পরীক্ষা তাই শুধু একটি গুহা-অভিযানের গল্প নয়। এটি মানুষের ঘুম, স্মৃতি, একাকিত্ব এবং জৈবিক ঘড়ির রহস্য বোঝার জন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
Visit our homepage → Ebook Bangla Free Books

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন