বৈশিষ্ট্য

Tantra in the depths of science the main secret of Shiva Sutra and Vigyan Bhairav ​​Tantra

 বিজ্ঞানের গভীরে তন্ত্র । শিব সূত্র ও বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্রের মূল রহস্য। জানবেন শিব আসলে কি? খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনযোগ দিয়ে পুরো টা ঠান্ডা মাথায় বুঝে পড়ুন || Tantra in the depths of science. The main secret of Shiva Sutra and Vigyan Bhairav ​​Tantra. Do you want to know what Shiva really is? Read the whole thing with a cool head, paying attention to very important things


Shiv


আজ আমি আপনাকে এমন এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে এসেছি, যা আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় আধ্যাত্মিক গ্রন্থ বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্র এবং শিবসূত্রে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রাচীন ঋষিগণ তাদের সমগ্র জীবনে এই দর্শনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। আমরা ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি  শিব হলেন একজন দেবতা। তিনি কৈলাস পর্বতে বসেন। তার মাথায় জটা, গলায় সাপ, হাতে  ত্রিশুল। কিন্তু আপনি কি জানেন এটি শিবের আসল রূপ নয়। এটি কেবল একটি বাহ্যিক প্রতীক মাত্র। তন্ত্রের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যটি হল শিব কোন ব্যক্তি নন। শিব কোন মানুষ বা দেবতা নন। শিব হলেন একটি পরম অবস্থা। স্টেট অফ কনসিয়াসনেস।  শিব হলেন আপনার ভেতরের সেই পরম শূন্যতা। যেখানে পৌঁছাতে পারলে পৃথিবীর কোন দুঃখ, কোন অবসাদ, কোন চিন্তা আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আজকের এই লেখাটি তে আমি প্রচলিত পৌরাণিক  রূপকথার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং মনস্তাত্বিক উপায়ে আলোচনা করব ।  কিভাবে আপনার ভেতরের সেই শিবত্বকে জাগিয়ে তোলা যায়?  কুন্ডলিনী শক্তির আসল বিজ্ঞান কি? কেন আমাদের শ্বাসপশ্বাসের মাঝেই লুকিয়ে আছে ঈশ্বরের ঠিকানা? কিভাবে আপনার দুই ভ্রুর মাঝখানের ওই ছোট্ট গ্রন্থিটি আপনার জীবনকে আমুল বদলে দিতে পারে?  যদি আপনি আপনার জীবনের মানসিক অশান্তি, অবসাদ এবং প্রতিদিনের অন্তহীন বিশৃঙ্খলা থেকে চিরতরে মুক্তি চান তবে আগামী কয়েকটি মিনিট আপনার কান এবং মনকে সম্পূর্ণ খোলা রাখুন। কারণ এই জ্ঞান আপনার ভেতরের সমস্ত অহংকার এবং অন্ধবিশ্বাসকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। এটি সুন্দর কিন্তু এটি অত্যন্ত বিপদজনক যদি আপনি একে অবহেলা করেন।


 চলুন তবে প্রবেশ করা যাক তন্ত্রের সেই আদি এবং গোপন গর্ভগৃহে। চলুন শুরুতেই আমাদের মনের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটিকে ভেঙে ফেলা যাক। আপনি যখনই কোন শিব মন্দিরে যান আপনি পাথরের একটি মূর্তির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। আপনি ভাবেন কৈলাশে বসে থাকা কোন এক ঈশ্বর আপনার উপর অলৌকিক কৃপা করবেন। কিন্তু বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্রে ভগবান মহাদেব শংকর স্বয়ং দেবী পার্বতীকে বলছেন দেবী মানুষ যে সাকার রূপকে পূজো করে তা আমার আসল স্বরূপ নয়। ওটা তো কেবল প্রাথমিক মনের অবোধ অবুঝ মানুষদের মনকে ধরে রাখার একটা অবলম্বন মাত্র। 


তাহলে শিব কে?

*********************

Shiva Lingo


 শিব হলেন পরম শূন্য। আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্স আজ যা আবিষ্কার করছে , তন্ত্র তা হাজার বছর আগে ঘোষণা করে দিয়েছে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে এই মহাবিশ্বের ৯৯.৯৯ পারসেন্টেজ স্থানই হলো সম্পূর্ণ ফাঁকা বা শূন্য। আর এই শূন্যতা থেকেই সমস্ত পরমাণু  জন্ম নেয় এবং একসময় এই শূন্যতাতেই বিলীন হয়ে যায়। তন্ত্র  এই পরম শূন্যতাকেই বলে শিব। শিব হলেন সেই ক্যানভাস যার উপর পুরো মহাবিশ্ব আঁকা হয়েছে। যখন আপনি শিবকে একজন ব্যক্তি ভাবেন ,তখন আপনি নিজেকে তার থেকে আলাদা করে ফেলেন। আপনি হয়ে যান পূজারী আর তিনি হয়ে যান ঈশ্বর। কিন্তু তন্ত্র দ্বৈতবাদে  বিশ্বাস করে না। তন্ত্র বলে অদ্বৈত। অর্থাৎ আপনিই তিনি। আপনার ভেতরে যে পরম নীরবতা লুকিয়ে আছে যা আপনার চিন্তারও গভীরে অবস্থান করে তাই হল শিব। এখানেই আসে শিবলিঙ্গের আসল রহস্য। অনেকেই শিবলিঙ্গ নিয়ে নানা রকমের বিকৃত ব্যাখ্যা দেন। কারণ তারা এর গভীর বিজ্ঞানটা বোঝেন না। লিঙ্গ শব্দের আসল অর্থ হলো প্রতীক বা চিহ্ন। শিবলিঙ্গের কোন হাত নেই, পা নেই, মুখ নেই, কোন নির্দিষ্ট আকার বা সীমা নেই। এটি ডিম্বাকৃতি যা নির্দেশ করে আমাদের এই  মহাবিশ্বের আকারকে। এটি একটি স্তম্ভের মতো,  যার কোন শুরু নেই এবং কোন শেষ নেই। শিবলিঙ্গ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বর নিরাকার, নির্গুণ এবং অসীম। যখন আপনি পাথর বা মাটির শিবলিঙ্গে জল ঢালছেন ,তখন আসলে আপনি সেই পরম প্রতীককে সম্মান জানাচ্ছেন যা আপনার নিজের ভেতরেই বিরাজমান। শিবকে বাইরে খোঁজা সম্পূর্ণ পন্ডশ্রম। প্রাচীন ঋষিগণ বলতেন যতক্ষণ তুমি মনে করবে ঈশ্বর বাইরে কোথাও আছেন ততক্ষণ তুমি আধ্যাত্মিকতার কিছুই শেখোনি। যেদিন তুমি চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতরের শূন্যতার স্বাদ পাবে ,সেদিন তুমি বুঝবে শিবকে,  নিজের ভেতরে সেই পরম অবস্থাকে জাগানোই হলো প্রকৃত তন্ত্র সাধনা। 


এবার আমি আলোচনা করবো মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় জৈবিক এবং আধ্যাত্মিক রহস্য নিয়ে, যা আপনার স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেমের সাথে সরাসরি যুক্ত। 

********************************************


তন্ত্র মানুষের শরীরকে কেবল রক্ত মাংসের দলা মনে করে না। তন্ত্রের মতে , আমাদের শরীর হলো ব্রহ্মান্ডের একটি ক্ষুদ্রতম রূপ। আমাদের মেরুদন্ডের ঠিক শেষ প্রান্তে অর্থাৎ মূলাধার  চক্রে সুষুম্না নাড়ির গোড়ায় একটি শক্তি সাপের মত সাড়ে তিন পাক জড়িয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন রয়েছে। একে বলা হয় কুন্ডলিনী শক্তি। তন্ত্রের প্রতীকী ভাষায় এই শক্তিই হলেন দেবী পার্বতী বা মহাপ্রকৃতি। এই শক্তি কি? এটি হলো আপনার ভেতরের সমস্ত সুপ্ত সম্ভাবনা। আপনার আদিম শক্তি, আপনার সেক্সুয়াল এনার্জি এবং আপনার বেঁচে থাকার মূল চালিকা শক্তি। বর্তমানে আপনার এই শক্তিটি নিচের দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে আছে। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষের সমস্ত শক্তি কেবল কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এবং ভয়ের মত নিম্নস্তরের আবেগে খরচ হয়ে যায়। আর আমাদের এই মেরুদন্ডের ঠিক সর্বোচ্চ শিখড়ে আমাদের মস্তিষ্কের ব্রহ্মতালুতে বা সহস্রার চক্রে অবস্থান করছে  পরম চেতনা,  যার প্রতীকী নাম হলো শিব। শিব হলেন পরম শান্ত ও নিস্পন্দ। যেখানে কোন আলোরণ নেই। কোন চিন্তা নেই। কেবল এক অনন্ত শান্তি রয়েছে। তন্ত্র সাধনার মূল লক্ষ্যই হলো এই নিচে থাকা শক্তিকে পার্বতীকে জাগিয়ে তুলে মেরুদন্ডের মাঝখান  দিয়ে প্রবহমান সুষুম্না নাড়ির ভেতর দিয়ে  ৭টি চক্রকে ভেদ করে উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া। যখন এই কুন্ডলিনী শক্তি ক্রমশ ঊর্ধগামী হয়ে সহস্রারে পৌঁছায় তখন সেখানে ঘটে শিব এবং শক্তির মহামিলন। এই মিলন কোন রূপকথা নয়। এটি আপনার চেতনার এক অভূতপূর্ব রূপান্তর। যখন আপনার শরীরের সমস্ত জৈবিক শক্তি মস্তিষ্কের উচ্চতর কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছায় তখন আপনার মন পুরোপুরি শান্ত হয়ে যায়। আপনার মন থেকে আমি বা অহংকার সম্পূর্ণ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। আপনি আর নিজের শরীর বা মনের ক্ষুদ্র গন্ডিতে আটকে থাকেন না। সেই পরম মিলনের মুহূর্তে সাধকের মুখ থেকে সতস্ফুর্তভাবে বেরিয়ে আসে শিবহম ।আমি সেই শিব। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা কি জানেন? আমাদের শক্তি জন্ম জন্মান্তর ধরে কেবল নিচের দিকেই প্রবাহিত হতে অভ্যস্ত। একটি নদী যা শত শত বছর ধরে একদিকে বয়ে চলেছে,  তাকে কি আপনি একদিনে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারবেন? পারবেন না। এর জন্য প্রয়োজন এক পরম বিজ্ঞান এক নিখুঁত প্রযুক্তি। আর এই প্রযুক্তি লুকিয়ে আছে বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্রের  তিনটি প্রধান দ্বারে যা নিয়ে আমি এবার বিস্তারিত আলোচনা করব। 


কি সেই তিনটি দ্বার বা দরজা বা টেকনিক? বা নিখুঁত প্রযুক্তি??

*******************************************


বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্রে ভগবান শিব দেবী পার্বতীকে ১১২টি ধ্যানের পদ্ধতির কথা বলেছেন। এই ১১২ টি পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কার্যকরী তিনটি দ্বার বা দরজা বা টেকনিক আজ আমি খুব সহজ ভাষায় বোঝাবো , যা আপনি আপনার প্রতিদিনের জীবনে আজ থেকেই প্রয়োগ করতে পারবেন। 


প্রথম দ্বার শ্বাস। 

**********************


আমরা সবাই শ্বাস নিই। শ্বাস না নিলে আমরা মরে যাব। কিন্তু আমরা যেভাবে শ্বাস নিই তা অত্যন্ত যান্ত্রিক এবং অচেতন। আপনি যখন রেগে যান আপনার শ্বাসের গতি বেড়ে যায়। আপনি যখন শান্ত থাকেন আপনার শ্বাস ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ আপনার শ্বাসের সাথে আপনার মনের গভীর সংযোগ রয়েছে। বিজ্ঞান ভৈরব তন্ত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত সূত্রে মহাদেব বলছেন যখন শ্বাস ভেতরে আসে এবং যখন শ্বাস বাইরে যায় এই দুয়ের মাঝখানে যে এক মুহূর্তের স্তব্ধতা বা শূন্যতা থাকে দেবী আমি সেখানেই বিরাজ করি। মনোযোগ দিয়ে বুঝুন। আপনি যখন শ্বাস ভেতরে নেন তখন শ্বাসটি ভেতরে গিয়ে এক মিলি সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ায়। তারপর আবার বাইরে বেরিয়ে আসে। ঠিক একইভাবে শ্বাস যখন পুরোপুরি বাইরে চলে যায় তখন বাইরেও সেটি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয় তারপর আবার ভেতরে আসে। এই যে শ্বাস নেওয়া এবং ছাড়ার মাঝখানের যে অত্যন্ত ক্ষুদ্র সন্ধিক্ষণ বা গ্যাপ এই শূন্যতাই হলো শিবের প্রবেশদ্বার। সাধারণ মানুষ এত বেশি অসচেতন এবং ব্যস্ত যে তারা এই গ্যাপটিকে কখনোই খেয়াল করে না। তন্ত্র বলে আপনি যখনই সময় পাবেন চোখ বন্ধ  করে আপনার শ্বাসের এই আসা যাওয়াকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকুন। যখন আপনি এই শ্বাসের ভেতরের এবং বাইরের সেই সন্ধিক্ষণ বা শূন্যতায় নিজের মনকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন তখন অলৌকিকভাবে আপনার মন এক সেকেন্ডের মধ্যে চিন্তাশীল হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাবে। এটাই হলো মনকে তাৎক্ষণিকভাবে শান্ত করার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক চাবিকাঠি। 


দ্বিতীয় দ্বার ত্রিনেত্র বা তৃতীয় চোখ। 

*************************************


দেখবেন মহাদেবের কপালে একটি তৃতীয় চোখ আছে এবং আমরা জানি সেই চোখ খুললে নাকি সামনে যা থাকে তা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এটিও একটি পরম মনস্তাত্বিক সত্য। আমাদের দুই ভ্রুর ঠিক মাঝখানে যেখানে আজ্ঞাচক্র অবস্থিত তার ঠিক পেছনে আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি রয়েছে,  যার নাম পিনিয়াল গ্ল্যান্ড। আধুনিক বিজ্ঞান বলে এই গ্রন্থিটি আমাদের সচেতনতা এবং ঘুমের চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে । একেই প্রাচীন যোগীরা বলতেন তৃতীয় চোখ । যখন আপনি আপনার দুটি বাহ্যিক  চোখ বন্ধ করে আপনার সম্পূর্ণ মনোযোগ এই দুই ভ্রুর মাঝখানের বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করেন তখন আপনার মস্তিষ্কে আলফা এবং থেটা ব্রেনওয়েভ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে আপনার মনের ভেতরে চিন্তার অবিরাম  ভিড় আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় ম্যাজিকটি কি জানেন? যখন আপনি আজ্ঞাচক্রে মনোযোগ দেন তখন আপনি নিজের  মনের একজন সাক্ষী অবজারভার হয়ে যান। ধরুন আপনার রাগ উঠলো। সাধারণ অবস্থায় আপনি রাগের মাথায় চিৎকার করে ওঠেন। অর্থাৎ আপনি নিজেই রাগ হয়ে যান। কিন্তু তৃতীয় চোখের সাধনায় আপনি রাগটাকে নিজের থেকে আলাদা করে দেখতে পান। আপনি ভাবেন ওই দেখো আমার ভেতরে রাগ উঠছে। তন্ত্রের নিয়ম হলো যা দেখা যায় তা দুর্বল হয়ে যায়। যখনই আপনি আপনার ক্রোধ আপনার ভয় বা আপনার বাসনাকে একজন তৃতীয় ব্যক্তির মত দূর থেকে সাক্ষী রূপে দেখতে শুরু করবেন তখনই শিবের ত্রিনেত্রের আগুনে সেই রাগ বা ভয় পুড়ে ভস্মীভূত  হয়ে যাবে। এই দৃষ্টি বাইরে থেকে আসে না। এই দৃষ্টি ভেতর থেকে জ্বালাতে হয়। 


তৃতীয় দ্বার নাথ বা ধ্বনি।

************************** 


শিবকে বলা হয় নাদ ব্রহ্ম। ধনি বা সাউন্ড।  ভাইব্রেশন এর মাধ্যমেও সেই পরম শূন্যতায় পৌঁছানো সম্ভব। আমরা সবাই জানি শিবের মহামন্ত্র হলো ওম্  নমঃ শিবায়। কিন্তু আমরা যেভাবে তোতা পাখির মত এই মন্ত্র জপ করি তাতে কোন লাভ হয় না। তন্ত্রের গভীর বিজ্ঞান অনুযায়ী এই মন্ত্রটি আসলে আমাদের মহাবিশ্বের পাঁচটি উপাদানের বা পঞ্চভূতের ধ্বনি তরঙ্গের সমষ্টি। ন- পৃথিবী তত্ত্ব,  ম -জল তত্ত্ব,  শি-  অগ্নিতত্ত্ব , বা -  বায়ুতত্ত্ব , য়  - আকাশ তত্ত্ব , আর ওম হলো সেই সমস্ত কিছুর অতীত পরম শূন্যতার প্রতীক। যখন আপনি এই মন্ত্রটি কেবল ঠোঁট দিয়ে উচ্চারণ না করে আপনার নাভিদেশ থেকে উচ্চারণ  করবেন এবং এর কম্পন বা ভাইব্রেশনকে আপনার পুরো শরীরে অনুভব করবেন তখন আপনার শরীরের প্রতিটি কোষ এবং এই পাঁচটি উপাদান শুদ্ধ হতে শুরু  করে। ঋষিগণ বলতেন , মানুষ মন্ত্র জপ করে আর হাতে মালা গুনে , এক মালা ,দুই মালা , ১০  মালা। তারা ভাবে যত বেশি সংখ্যায় জপ করবে শিব তত বেশি খুশি হবেন। এটা পরম মূর্খতা। শিব কোন মানুষ নন , যে তিনি আপনার সংখ্যা দেখে খুশি হবেন। তিনি সংখ্যা বোঝেন না তিনি বোঝেন ভাব এবং সচেতনতা। যান্ত্রিকভাবে ১০০০ বার নমঃ শিবায় বলার চেয়ে পুরো অস্তিত্ব দিয়ে সম্পূর্ণ সচল হয়ে গভীর ভালোবাসায় মাত্র একবার "ওম নমঃ শিবায়" বলা হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। যখন জপকারী এবং জপের মধ্যে কোন তফাত থাকে না। যখন আপনি নিজেই সেই ধনী হয়ে যান।  তখনই নাদ ব্রহ্মের দরজা খুলে যায়।  এই হলো তিন টি দ্বার। 


এবার আসুন আমরা এমন একটি সত্যের মুখোমুখী হই যা শুনলে আপনার অহংকারে আঘাত লাগতে পারে। শিব আপনার কোনো পূজো কোনো দামী ভোগ বা কোনো অহংকার দিয়ে তৈরি করা বড় মন্দির দেখে প্রসন্ন হন না। শিব কেবল একটি জিনিসেই গলে  যান। আর তা হলো পূর্ণ সমর্পণ। সমর্পণ শব্দের অর্থ কি? সমর্পণ মানে কি? নিজেকে দুর্বল করে দেওয়া ? সমর্পণ মানে কি? কাপুরুষের মত সংসার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া?  একদমই নয়। সমর্পণ মানে হলো নিজের ভেতরের আমি বা অহংকারকে সম্পূর্ণভাবে মিটিয়ে দেওয়া। যতক্ষণ আপনার মনে এই ভাব থাকবে যে আমি কত বড় জ্ঞানী। আমি কত বড় সাধক। আমি এত পূজো করি ততক্ষণ আপনি শিবের থেকে মাইলের পর মাইল দূরে আছেন। ঋষিগণ একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বলতেন,  একটি বাঁশ তখনই সুন্দর সুর তৈরি করতে পারে যখন সে ভেতর থেকে পুরোপুরি ফাঁকা বা খালি হয়। যদি বাঁশের ভেতরে কাদা বা ময়লা ভরা থাকে তবে ফু দিলেও তা থেকে কোন সুর বেরোবে না।  ওটা কেবল একটা কাঠের টুকরো হয়েই থাকবে। ঠিক একইভাবে আপনি যদি আপনার জ্ঞান, আপনার অহংকার, আপনার অতীত এবং আপনার সংস্কার দিয়ে নিজেকে ভর্তি করে রাখেন তবে শিবের  মহাজাগতিক শক্তি আপনার ভেতরে প্রবেশ করার কোন জায়গা পাবে না। আপনাকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ খালি হতে হবে। আপনি প্রতিটি শিব মন্দিরের বাইরে একটি ষাঁড়কে বসে থাকতে দেখেন যার নাম নন্দী। কখনো ভেবে  দেখেছেন নন্দী কেন মন্দিরের ভেতরে না গিয়ে সবসময় দরজার বাইরে বসে থাকে। ষাঁড় হলো অপরিসীম শক্তি এবং কান্নার প্রতীক। কিন্তু নন্দী তা সমস্ত শক্তি এবং চেতনাকে শিবের চরণে সমর্পণ করে শান্ত হয়ে বসে আছে। তার ভেতরে কোন তাড়াহুড়ো নেই, কোন ছটফটানি নেই, কোন দাবি নেই। সে কেবল এক অনন্তকাল  ধরে তার প্রভুর জন্য অপেক্ষা করছে। নন্দীর এই নিঃশর্ত প্রতীক্ষা এবং নিস্পন্দতাই হলো প্রকৃত ভক্তি। আমরা যখন মন্দিরে যাই আমরা শিবের কাছে শুধু লিস্ট নিয়ে যাই।  আমাকে এটা দাও ওটা দাও আমার চাকরি করে দাও , আমার অসুখ ছাড়িয়ে দাও, ।  আমরা শুধু চাইতে জানি । তন্ত্র বলে যেদিন আপনি শিবের সামনে গিয়ে কোন কিছু না চেয়ে বলবেন , হে মহাদেব আমার জন্য কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ তা আমি জানিনা , কারণ আমার বুদ্ধি অত্যন্ত সীমিত,  আমি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে তোমার হাতে ছেড়ে দিলাম, ।  যেদিন আপনার ভেতরের এই আমিটা হারিয়ে যাবে,  সেইদিনই আপনার ভেতরে আসল শিবের জন্ম হবে। তন্ত্রে একটি অত্যন্ত গোপন ও গভীর সাধনার কথা বলা হয়েছে যার নাম শবাসন বা শিব সাধনা। শব শব্দের অর্থ হলো মৃতদেহ আর শিব শব্দের অর্থ হলো পরম চেতনা। একটি মৃতদেহের মধ্যে যখন চেতনা প্রবেশ করে তখনই সে সচল হয়। আর চেতনা বেরিয়ে গেলে সে আবার শব হয়ে যায়। শবাসন কেবল যোগ ব্যায়ামের কোন রিলাক্সেশন টেকনিক নয়। এটি মৃত্যুর একটি জীবন্ত মোহরা। 




Shiv lingo


আপনি যখন এই সাধনায় বসবেন বা শোবেন তখন আপনার শরীরকে পুরোপুরি একটা লাশের মত ছেড়ে দিতে হবে। যেন এই শরীরের উপর আপনার আর কোন অধিকার নেই। আপনার হাত, পা, পিঠ, ঘাড়ের প্রতিটি পেশির সমস্ত  টান সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হবে। শরীরকে সম্পূর্ণ স্থির করার পর, আপনার শ্বাস এত ধীর এবং সূক্ষ হয়ে যাবে যে আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না শ্বাস চলছে কি চলছে না। এই অবস্থায় আপনার মনের ভেতরে সমস্ত চিন্তার ঝড় একসময় পুরোপুরি থমকে যায়। আপনার নাম, আপনার পরিচয়, আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স, আপনার  অতীত সবকিছু উবে যায়। আপনি অনুভব করেন আপনি শরীরও নন আপনি মনও নন। যখন আপনার ভেতরের এই পরম খালি মন বা শূন্যতা তৈরি হয় তখনই সেই শূন্যতার গর্ভে শিবের আসল অভিষেক ঘটে। এই অভিষেক দুধ বা গঙ্গাজল দিয়ে হয় না। এই অভিষেক হয় আপনার নিজের চেতনার গভীর নীরবতা দিয়ে। এই শবাসনের গভীরে সাধক জীবনের প্রথমবার জানতে পারে সে আসলে কে। সেই মুহূর্তে আপনার আর কোন প্রশ্ন থাকে না, কোন ভয় থাকে না, কোন সংশয় থাকে না। থাকে কেবল এক অনন্ত অপার আনন্দ। আর তন্ত্র বলে সেই পরম আনন্দই হলো স্বয়ং শিব। কিন্তু থামুন। এই তন্ত্রের পথ যতটাই সুন্দর ততটাই ভয়ঙ্কর এবং মারাত্মক হতে পারে ,যদি আপনি  ভুল পথে হাঁটেন। আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় বা ইন্টারনেটে অনেক শক্তি  বা তন্ত্রের কথা শুনে অনেকেই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারা বলেন আজ থেকেই ধ্যান শুরু করে দেব। কালকেই মূল গোড়ায় পৌঁছে যাবো। আর পরশুই আমার কুন্ডলিনী জাগিয়ে ভগবান হয়ে যাব। মনে রাখবেন এখানেই মানুষের সবচেয়ে বড় পতন শুরু হয়। শিব সাধনা কোন ল্যাবোরেটরির খামখেয়ালি পরীক্ষা নয়,  যা আপনি হুট করে শুরু করে দেবেন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রূপান্তর যা বছরের পর বছর ধরে ধাপে ধাপে আপনার ভেতরে খুব ধীর গতিতে ঘটে । তাই জোড় পূর্বক তাড়াহুড়ো করে কিছু করতে যাবেন না। তাড়াহুড়ো করলে,এর পরিণতি কি হয়েছে জানেন? তাদের পুরো স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেম সেই তীব্র শক্তির চাপ সহ্য করতে না পেরে পুড়ে গেছে। শরীরে প্রচন্ড দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা, মনের ভেতরে তীব্র বিভ্রান্তি, অনিদ্রা এবং অনেকেই চিরতরে মানসিক ভারসাম্য পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন। 


শিবের আরেক নাম হলো ভৈরব। আর ভৈরব শব্দের অর্থ হল যিনি পরম ভয়ঙ্কর। তিনি কেন ভয়ঙ্কর? কারণ তিনি আপনার মনের সমস্ত ভ্রম এবং অহংকারকে এক সেকেন্ডে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারেন। আপনি যদি আপনার ক্ষুদ্র অহংকার, আপনার লোভ বা অলৌকিক ক্ষমতা পাওয়ার বাসনা নিয়ে শিবের দরজায় যান তবে তিনি আপনার বাসনা পূরণ করবেন না। তিনি আপনার অহংকারকে এমনভাবে ভাঙবেন যা আপনার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক হবে। সেই কারণেই তন্ত্রের মহান সিদ্ধ পুরুষেরা এবং প্রাচীন ঋষিগণ সবসময় বলেছেন কুন্ডলিনী বা উচ্চতর সাধনার আগে নাড়ি শুদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। 


নাড়ি শুদ্ধি কি ? 

**********************


এক, আপনার শরীরকে আগে প্রস্তুত করতে হবে । তার জন্য প্রয়োজন এক পরিষ্কার ও সাত্ত্বিক আহার। তা আমিষ নিরামিষ বলে কোনো কথা নেই। এমন খাবার যা আপনার শরীর কে কষ্ট দেবে না। প্রত্যেকের দৈহিক গঠন আলাদা, তাই শরীর সাধনার মাধ্যমে বূঝতে হয় আপনার শরীর কি খাবার চাইছে।


 দুই ,অনর্থক  রাগ,  পরনিন্দা এবং ফালতু তর্কে নিজের এনার্জি বা শক্তি নষ্ট না করা।


 তিন , নিজের মনের ভেতরের প্রতিদিনের নোংরা আবর্জনাকে আগে পরিষ্কার করা। যদি আপনার ভেতরের পাত্রটি নোংরা থাকে তবে তাতে অমৃত ঢাললেও তা বিষ হয়ে যাবে। শিব হলেন পরম আলো। আর সেই আলো কোন নোংরা বা অপবিত্র পাত্রে কখনো অবস্থান করতে পারে না। তাহলে এতক্ষণের আলোচনা থেকে আজ আপনারা নিজেদের জীবনে কি নিয়ে যাবেন? আপনারা কি ভাবছেন শিবকে পেতে হলে আপনাকে কালকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে চাকরি বাকরি ছেড়ে হিমালয়ের কোন অন্ধকার গুহায় চলে যেতে হবে একেবারেই না । শিব কখনো সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলেননি।  শিবের চেয়ে বড় উদাহরণ আর কে হতে পারে তিনি স্বয়ং একজন গৃহস্থ।   দেবী পার্বতী তার স্ত্রী । তিনি সংসারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করেন । আবার একই সাথে তিনি হলেন মহাযোগী। এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় তপস্বী। মহাদেবের সবচেয়ে বড় বার্তা এটাই। সংসারে থাকুন। কিন্তু সংসারের মোহজালে জড়িয়ে যাবেন না। সংসারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের সচেতনতাকে জাগিয়ে রাখাই হলো আসল তন্ত্র। 


তাহলে আমার এই লেখাটি পড়ে কি করবেন আজ থেকে? আজ থেকে এই মুহূর্ত থেকে আপনি আপনার জীবনে মাত্র তিনটি ছোট ছোট পরিবর্তন নিয়ে আসুন। 

*******************************************


প্রথমত :- দিনে যখনই সময় পাবেন বাসে ট্রামে অফিসে বা নিজের ঘরে মাত্র এক মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করুন। আপনার শ্বাসের আসা যাওয়াকে লক্ষ্য করুন এবং ওই দুই শ্বাসের মাঝখানের যে পরম নীরব মুহূর্ত বা গ্যাপ তাকে খোঁজার  চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন সেখানেই শিব আছেন। 


দ্বিতীয়ত:--  যখনই আপনার ভেতরে তীব্র রাগ উঠবে, ভয় জাগবে বা কোন মানসিক অবসাদ আসবে তখনই রিএক্ট করবেন না। এক মুহূর্ত থামুন। দূর আকাশের মেঘ দেখার মত করে নিজের ভেতরের সেই আবেগকে সাক্ষী রূপে দেখতে থাকুন। জানবেন আপনার ভেতরের শিবের তৃতীয় চোখটি  আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করেছে। 


তৃতীয়ত :-- যখনই আপনি মন্ত্র জপ করবেন বা ঈশ্বরের নাম নেবেন তা যান্ত্রিকভাবে করবেন না। প্রতিটা শব্দের কম্পনকে নিজের হৃদয়ে নিজের শরীরে অনুভব করুন। মনে রাখবেন আপনি যখন কোন মন্দিরে গিয়ে শিবলিঙ্গকে দেখছেন তখন জানবেন ওটা একটা আয়না মাত্র। ওটা আপনাকে ইশারা করছে যে যাকে তুমি বাইরে খুঁজছো সে তো তোমার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। আপনার অহংকারের যে ধুলো জমেছে সাধনার মাধ্যমে শুধু সেই ধুলোটাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। যেদিন আপনার ভেতরের এই আমির বা অহংকার পুরোপুরি গলে যাবে। সেদিন কোনো পূজারী থাকবে না, কোন মন্দির থাকবে না, কোন পূজোও থাকবে না। সেদিন আপনার প্রতিটি শ্বাসে আপনার প্রতিটি কর্মে কেবল শিবই অবশিষ্ট থাকবেন। আপনি নিজেই হয়ে উঠবেন শিব। নিজের ভেতরের সেই পরম শিবকে জাগিয়ে তুলুন। শিবকে বাইরে খোঁজার কোন প্রয়োজন নেই। শিবকে শুধু নিজের  ভেতরে চেনার প্রয়োজন রয়েছে। আপনার ভেতরের সেই পরম শিবত্বকে আমার প্রণাম। আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সচেতন থাকুন।



Visit our homepage → Ebook Bangla Free Books



Hubble Space Telescope 36 Years of Discoveries Images and Space Exploration Revolution




মাটির নিচে ২০৫ দিন ঘড়ি-ক্যালেন্ডার ছাড়া মানুষের শরীর কীভাবে সময় অনুভব করে? || How does the human body experience time without a clock



    

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ